শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

প্রধান উপদেষ্টার আত্মপক্ষ

সদ্য সমাপ্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট  নির্বাচন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইট এবং পরবর্তীতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু অভাবনীয় ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে গেছে। সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইট করার পর এদেশে সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়ে বাণিজ্যকারীরা অতি আনন্দে মেতে ওঠেন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তারা নিজেরাই বিজয়ী হয়েছেন বলে মনে করতে শুরু করেন। এমনকি তারা নব নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের ছবি সম্বলিত প্লাকার্ড নিয়ে মিছিল করার ঘোষণা দেন। কিন্তু ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে তা সম্ভব হয়নি।

পতিত স্বৈরাচারের ভাবখানা এরকম যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমান সরকারকে হটিয়ে আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। কিন্তু তাদের সে আশায় গুড়ে বালি পড়েছে। বিলম্বে হলেও সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ায় হঠাৎ করে কোনো নেতিবাচক বিষয়ের উত্থান দেখতে পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের সাথে তার কোনো সমস্যা নেই। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এমন কিছু নয়, কে প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন, যা তার ওপর নির্ভর করে।’ অধ্যাপক ইউনূস বলেন, রিপাবলিকান পার্টি বা ডেমোক্রেটিক পার্টি এমনকি ট্রাম্পের বিষয়েও তার কোনো সমস্যা নেই। প্রধান উপদেষ্টার ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে অতীতে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না এবং উভয় দলেই তার বন্ধু রয়েছে। জানা গেছে, অভিষেক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সব ঠিক থাকলে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে পা রাখবেন। তার আগ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শীর্ষ পদে বহাল থাকবেন। এর আগে ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন ট্রাম্প।

অবশ্য নবনির্বাচিত এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় বাংলাদেশ নিয়ে একটি টুইট করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বেশ শোরগোল পাকিয়ে দিয়েছিলেন। এতে পতিত আওয়ামী লীগের মধ্যে অতি উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। সে টুইটে মার্কিন নির্বাচনের আগে ‘হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত সহিংসতার’ নিন্দা জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘যারা বাংলাদেশে বিক্ষুব্ধ জনতার দ্বারা আক্রান্ত ও লুটপাটের শিকার হচ্ছে’। টুইটে ট্রাম্প লেখেন, ‘আমার নজরদারিতে এটা কখনোই ঘটত না। কমলা ও জো বিশ্বজুড়ে এবং আমেরিকায় হিন্দুদের উপেক্ষা করেছেন। ইসরাইল থেকে ইউক্রেন পর্যন্ত আমাদের নিজস্ব দক্ষিণ সীমান্ত পর্যন্ত একটি বিপর্যয় হয়েছে, তবে আমরা আমেরিকাকে আবার শক্তিশালী করব এবং শক্তির মাধ্যমে শান্তি ফিরিয়ে আনব!’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইট বিষয়ে আল জাজিরার এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এটা মূলত অপপ্রচার-সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অপপ্রচার। এটা দুর্ভাগ্যজনক।’ তিনি বলেন, বেশিরভাগ অপপ্রচারের উৎপত্তি ভারত থেকে। যে কারণেই হোক না কেন-সম্ভবত অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রাখার জন্য এসব করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই’ উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘সহিংসতা শুরু হয়েছিল বিপ্লবের সময় হিন্দু বা অন্য ধর্মের কারণে নয়, বরং বেশির ভাগই তারা আওয়ামী লীগার ছিল বলে। হিন্দুদের অধিকাংশই ছিল আওয়ামী লীগার।’

এদিকে গত à§§à§­ নবেম্বর সন্ধ্যায় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সংখ্যালঘুরা কিছু ক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হয়, তবে তা সম্পূর্ণ অতিরঞ্জিত।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি তখন বাংলাদেশ ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত একটি দেশ। সে সময় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে অহেতুক আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।’ প্রধান উপদেষ্টা বলেন, মূলত রাজনৈতিক কারণে অল্প কিছু সহিংসতার ঘটনা রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইট এবং নির্বাচনে তার বিজয় মহল বিশেষ অতি উৎসাহী হয়ে উঠলেও বাস্তবতার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। মূলত,  ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসাবেই এবং ভারতীয়দের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই এমন টুইট করেছিলেন। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এর কোন গুরুত্ব আছে বলে মনে করেন না কূটনৈতিক মহল। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবার অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। বিষয়টি মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি চরম বাস্তবতারই প্রতিধ্বনি করছেন। ফলে অপপ্রচারকারীর মুখোশ উম্মোচন হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার আত্মপক্ষ দেশ ও জাতির জন্য এক নতুন দিকনির্দেশনা বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ